অতএব তারা আর দুই নয়, কিন্তু এক দেহ… –মথি ১৯:৬।
বিবাহ-সম্পর্কের সূচনা ঈশ্বর একেবারে সময়ের আদিতে করেছিলেন। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে যাওয়া নারী ও পুরুষ যদি এর সৌন্দর্য ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখতে চাইত, তবে ঈশ্বর সেই বিবাহকে আশীর্বাদ করারও প্রস্তাব দিয়েছিলেন (আদিপুস্তক ১:২৮)। সেই সময় থেকে শয়তান পবিত্র বিবাহের অস্তিত্বকে কলুষিত ও ধ্বংস করার জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করে এসেছে। আদিপুস্তক ৪:১৯-এ দেখা যায়, মানবজাতি ঈশ্বরের বিবাহ-পরিকল্পনাকে কলুষিত করতে বহুবিবাহ ব্যবহার করছিল। লেবীয় পুস্তকের ২১ ও ২২ অধ্যায়ে “বিবাহবিচ্ছেদ” নামে একটি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, যাতে “প্রথম প্রেম” আইনগতভাবে ভেঙে দেওয়া যায়। এর মধ্যে পুনর্বিবাহের সুযোগও ছিল। প্রথা হিসেবে প্রথম যখন এটি চালু হয়, তখন বিবাহবিচ্ছেদের দাবি ঈশ্বর নয়, মানুষই তুলেছিল; আর এর উদ্দেশ্য ছিল ততদিন পর্যন্ত আজীবন অঙ্গীকার বলে বোঝা বিষয়টিকে ভেঙে দেওয়া।
এই প্রবন্ধে আমরা কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করতে চাই:
- বিবাহ সম্বন্ধে বাইবেল কী শিক্ষা দেয়? ঈশ্বরের কাছে প্রথম বিবাহের কি কোনো বিশেষ মর্যাদা রয়েছে?
- বিবাহবিচ্ছেদ সম্বন্ধে বাইবেল কী শিক্ষা দেয়? স্বামী বা স্ত্রী—যে কেউ জীবিত থাকাকালে বিবাহবিচ্ছেদকে কি ঈশ্বর মূল বিবাহের অঙ্গীকারের সমাপ্তি বলে স্বীকার করেন?
- বিচ্ছিন্ন বা বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া প্রথম বিবাহ পুনর্মিলিত হওয়া সম্বন্ধে বাইবেল কী শিক্ষা দেয়?
এই অধ্যয়নের উদ্দেশ্য হলো ব্যাপকভাবে বিষয়টি বিবেচনা করা, একই সঙ্গে শাস্ত্রকে তার নিজস্ব ব্যাখ্যাকারী হতে দেওয়া, যাতে ভাষ্য ন্যূনতম রাখা যায়। এই লেখার উদ্দেশ্য হলো ঈশ্বরের বাক্য অধ্যয়নের মাধ্যমে তাঁর ইচ্ছা অনুসন্ধানে প্রার্থনাসহ অধ্যবসায়ে উৎসাহিত করা। প্রাসঙ্গিক সমস্ত শাস্ত্রাংশ ও সেগুলো যে প্রেক্ষাপটে লেখা হয়েছে, সেগুলো প্রার্থনাপূর্বক বিবেচনা করাই লেখকের আকাঙ্ক্ষা ছিল।
প্রথম বিবাহ সম্বন্ধে ঈশ্বরের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাইবেল কী শিক্ষা দেয়?
পুরাতন নিয়মে অন্তত পাঁচবার প্রভু প্রথম বিবাহকে একান্ত ও আজীবন বলে বর্ণনা করেছেন। নতুন নিয়মে যিশু ও প্রেরিতেরাও এই একই দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করেছেন।
তোমার উৎস আশীর্বাদপ্রাপ্ত হউক; এবং তোমার যৌবনকালের স্ত্রীর সহিত আনন্দ কর –হিতোপদেশ ৫:১৮। তোমার যৌবনকালের স্ত্রীর প্রতি দেওয়া গুরুত্ব লক্ষ করো।
কেননা সদাপ্রভু তোমাকে আহ্বান করিয়াছেন পরিত্যক্তা ও আত্মায় দুঃখিতা স্ত্রীলোকের ন্যায়, এবং যৌবনকালের স্ত্রীর ন্যায়, যাহাকে অগ্রাহ্য করা হইয়াছিল, তোমার ঈশ্বর বলেন –যিশাইয় ৫৪:৬। যৌবনকালের স্ত্রী হওয়ার পর পরে অগ্রাহ্য হওয়ায় এই পরিত্যক্তা নারীর দুঃখ আরও গভীর হয়েছিল।
তোমরা বল, কেন? কারণ তোমার ও তোমার যৌবনকালের স্ত্রীর মধ্যে সদাপ্রভু সাক্ষী ছিলেন, তাহার প্রতি তুমি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছ; সে তো তোমার সঙ্গিনী, তোমার নিয়মের স্ত্রী। তিনি কি তাদের এক করেননি? তবুও তাঁর মধ্যে আত্মার অবশিষ্টাংশ ছিল। আর কেন এক? যেন তিনি ঈশ্বরভক্ত বংশ খুঁজতেন। অতএব তোমরা আপন আপন আত্মার বিষয়ে সাবধান হও, আর কেহ যেন আপন যৌবনকালের স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা না করে। কেননা ইস্রায়েলের ঈশ্বর সদাপ্রভু বলেন, তিনি স্ত্রীকে ত্যাগ করাকে ঘৃণা করেন; কারণ সর্বশক্তিমান সদাপ্রভু বলেন, একজন নিজের বস্ত্রে হিংসা ঢাকে। অতএব তোমরা আপন আপন আত্মার বিষয়ে সাবধান হও, যেন বিশ্বাসঘাতকতা না কর –মালাখি ২:১৪-১৬। আর তারা কেন পরস্পরের এক, একে অপরের জন্য একান্ত? প্রভুর উদ্দেশে ঈশ্বরভক্ত বংশ উৎপন্ন করার জন্য। ঈশ্বর স্ত্রীকে ত্যাগ করা ঘৃণা করেন, তবুও মানুষ “বিবাহবিচ্ছেদ” নামের নাগরিক ও আইনগত স্বীকৃতির আচ্ছাদনে তা ঢাকার চেষ্টা করে।
মথি ১৯:৩-১২: ৪ পদে—আদিতে… ফরীশীরা যখন এই বিষয় নিয়ে যিশুকে প্রশ্ন করল, তখন তিনি তাদের তিরস্কার করে পিতার আদি অভিপ্রায়ের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন… তিনি উত্তর দিয়া তাহাদিগকে কহিলেন, তোমরা কি পাঠ কর নাই যে, সৃষ্টিকর্তা আদিতে তাহাদিগকে পুরুষ ও স্ত্রী করিয়া নির্মাণ করিয়াছিলেন –মথি ১৯:৪। এরপর তিনি তাদের শাস্ত্রের এই শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দিলেন, …মানুষ [ত্যাগ করিবে] [আপন] পিতা ও মাতাকে, এবং আপন স্ত্রীর সহিত আসক্ত হইবে, এবং সেই দুই একাঙ্গ হইবে? অতএব তাহারা আর দুই নয়, কিন্তু একাঙ্গ। সুতরাং ঈশ্বর যাহার যোগ করিয়া দিয়াছেন, মানুষ তাহার বিচ্ছেদ না করুক –মথি ১৯:৫-৬। বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহ সম্বন্ধে প্রকৃত সত্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে মানুষের কর্তৃত্বকে (দেওয়ানি আদালত) ঈশ্বরের কর্তৃত্বের সমান মনে কোরো না। আমাদের মনে রাখা দরকার, স্বর্গে প্রতিটি বিবাহ ঈশ্বরই একত্র করেছেন এবং জীবন-পুস্তকে তা লিখে রেখেছেন।
কেননা যে স্ত্রীলোকের স্বামী আছে, সে স্বামী জীবিত থাকিতে ব্যবস্থা দ্বারা তাহার সহিত বদ্ধ; কিন্তু স্বামী মরিলে সে স্বামীর ব্যবস্থা হইতে মুক্ত হয়। অতএব স্বামী জীবিত থাকিতে যদি সে অন্য পুরুষকে বিবাহ করে, তবে তাহাকে ব্যভিচারিণী বলা যাইবে; কিন্তু স্বামী মরিলে সে সেই ব্যবস্থা হইতে মুক্ত, সুতরাং সে অন্য পুরুষকে বিবাহ করিলেও ব্যভিচারিণী নয় –রোমীয় ৭:২-৩। আবারও, সত্যের ভিত্তি স্থাপন করার জন্য এটি আদিতে ফিরে যাওয়ার কথা বলছে।
স্বামী বা স্ত্রীর যেকোনো একজনের মৃত্যু হলেই কেবল স্বর্গীয় নথিতে প্রাথমিক বিবাহ-নিয়মের অবসান ঘটে। আর এই জীবন শেষ হয়ে গেলে অনন্তকালের জন্য কেবল স্বর্গীয় নথিই গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বাইবেলের আদর্শের কয়েকটি ব্যতিক্রম রয়েছে:
তোমরা পরস্পরকে বঞ্চিত [বঞ্চনা করিয়া, প্রাপ্য আটকে রাখিয়া] করিও না, কেবল কিছুকাল সম্মত হইয়া থাকিতে পার, যেন প্রার্থনা ও উপবাসে নিবিষ্ট থাকিতে পার; পরে আবার একত্র হও, পাছে তোমাদের অসংযমের [আত্মসংযমের অভাবের] জন্য শয়তান তোমাদিগকে পরীক্ষা করে –১ করিন্থীয় ৭:৫। সুতরাং, কোনো মহাগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঈশ্বরের অনুগ্রহ বা নির্দেশনা খোঁজার প্রয়োজন হলে, স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের স্বেচ্ছাসম্মতিতে কিছু সময়ের জন্য বিবাহ-সম্পর্ক থেকে বিরত থাকলে, কোনো কোনো পরিস্থিতিতে ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ হতে পারে। তবে এতে জড়িত উভয় স্বামী-স্ত্রীর স্পষ্ট উপলব্ধি ও অঙ্গীকার থাকা উচিত—কখন ও কীভাবে তারা আবার একত্র হবে, পাছে শয়তান তাদের পরীক্ষা করে। এই ব্যতিক্রমের তিনটি স্পষ্ট শর্ত আছে… ১) সম্মতিতে, ২) কিছু সময়ের জন্য, এবং ৩) প্রার্থনা ও উপবাসে নিবিষ্ট থাকার উদ্দেশ্যে।
আর বিবাহিত লোকদিগকে আমি আজ্ঞা দিতেছি—আমি নয়, কিন্তু প্রভু—স্ত্রী স্বামীকে ত্যাগ না করুক; কিন্তু যদি ত্যাগ করেও, তবে অবিবাহিতা থাকুক, কিম্বা স্বামীর সহিত সম্মিলিতা হউক; এবং স্বামী স্ত্রীকে ত্যাগ না করুক –১ করিন্থীয় ৭:১০-১১। এই শাস্ত্রাংশ নির্দোষ স্বামী বা স্ত্রীকে বাইবেলের বিচারে দোষী হওয়া থেকে মুক্ত রাখে, যখন অপরজনই বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে শিক্ষা এই রয়ে যায় যে, “মূল সঙ্গী জীবিত থাকা পর্যন্ত” তারা অন্য কাউকে বিয়ে করবে না।
বিবাহবিচ্ছেদ সম্বন্ধে ঈশ্বরের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাইবেল কী শিক্ষা দেয়?
বলা হইয়াছে, যে কেহ আপন স্ত্রীকে ত্যাগ করে, সে তাহাকে ত্যাগপত্র দিউক। কিন্তু আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, যে কেহ বিবাহপূর্ব অবৈধ যৌনাচার ছাড়া অন্য কারণে আপন স্ত্রীকে ত্যাগ করে, সে তাহাকে ব্যভিচার করায়; আর যে ব্যক্তি সেই বিবাহবিচ্ছিন্না স্ত্রীকে বিবাহ করে, সে ব্যভিচার করে –মথি ৫:৩১-৩২। যিশু তাঁর পর্বত-উপদেশে লোকদের শিক্ষা দেওয়ার সময় যে বহু বিষয়ে বারবার মনোযোগ দিয়েছিলেন, তার একটি ছিল বিবাহের জন্য ঈশ্বরের আদি পরিকল্পনার এই বিষয়টি।
“বিবাহপূর্ব অবৈধ যৌনাচার ছাড়া অন্য কারণে” বিবাহের আগে যেকোনো ধরনের অনৈতিক আচরণই অবৈধ যৌনাচার। প্রাচীন ইহুদি সংস্কৃতির রীতিনীতি বহু আগেই বিস্মৃত হওয়ায় আধুনিক খ্রিস্টধর্ম কখনো কখনো এই ধারণা নিয়ে সমস্যায় পড়ে। ইহুদি সংস্কৃতিতে বাগদানের সময়কালকে বিবাহ-অনুষ্ঠানের প্রায় সমান বাধ্যতামূলক বলে মনে করা হতো; এতটাই যে বাগদান ভাঙতে “বিবাহবিচ্ছেদ” প্রয়োজন হতো। এই ভিত্তিগত উপলব্ধি থেকে এখানে অবৈধ যৌনাচার বলতে বাগদান বা বিবাহের প্রতিশ্রুতির সময়কার অনৈতিক আচরণ বোঝানো হয়েছে। কোনো অবিশ্বস্ততা ধরা পড়লে বাগদান, বিবাহের প্রতিশ্রুতি বা এনগেজমেন্ট ভাঙতে ত্যাগপত্রের প্রয়োজন হতো। বিবাহবিচ্ছেদের এই নির্দিষ্ট দিকটির সমালোচনা যিশু করেননি। বাগদানের সময় বিবাহিত জীবনের শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের অনুমতি না থাকলেও তাদের স্বামী-স্ত্রী বলেই উল্লেখ করা হতো। অবশেষে, একে ব্যভিচার না বলে অবৈধ যৌনাচার বলার কারণ হলো, বাগদানের সময় দুজনের বিবাহ তখনও হয়নি, আর তাদের সম্পর্কের শারীরিক পরিণতিও ঘটেনি। তাই ঈশ্বরের দৃষ্টিতে তারা বিবাহিত বলে গণ্য হওয়ার ঠিক আগে অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক হলে তা হবে অবৈধ যৌনাচার; আর বিবাহিত বলে গণ্য হওয়ার ঠিক পরে একই ধরনের সম্পর্ক হলে তা হবে ব্যভিচার।
নিম্নলিখিত পদগুলোতে যোষেফ ও মরিয়মের ঘটনায় এই ধরনের পরিস্থিতির একটি চমৎকার বাইবেলীয় উদাহরণ আছে: যীশু খ্রীষ্টের জন্ম এইরূপে হইয়াছিল: তাঁহার মাতা মরিয়মের সহিত যোষেফের বাগদান হইয়াছিল; তাহাদের সহবাসের পূর্বে তিনি পবিত্র আত্মা হইতে গর্ভবতী বলিয়া দেখা গেলেন। তখন তাঁহার স্বামী যোষেফ ধার্মিক লোক হওয়াতে, তাঁহাকে লোকসমক্ষে লজ্জিত করিতে ইচ্ছা করিলেন না, গোপনে তাঁহাকে ত্যাগ করিতে মনস্থ করিলেন –মথি ১:১৮, ১৯।
সুতরাং, বাইবেলীয় দৃষ্টিতে বিবাহবিচ্ছেদ দেওয়ানি আইন অনুসারে প্রথম বিবাহকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে, কিন্তু ঈশ্বরের সামনে প্রথম বিবাহের অবসান ঘটাতে পারে না। বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে এমন ব্যক্তি প্রথম বিবাহের সঙ্গীই থেকে যায় (যতদিন অপর স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকে); পুনর্বিবাহ করলেও, আইনগতভাবে বিবাহবিচ্ছেদ হোক বা না হোক। ফলে উভয় পক্ষের জন্যই বাইবেলীয় অর্থে ব্যভিচার ঘটে। তবে বিবাহবিচ্ছেদকে যখন প্রাথমিক বিবাহ-নিয়ম ভেঙে দেওয়া বা বাতিল করার বৈধ উপায় বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তখন পরবর্তী বিবাহকে ঈশ্বর যে নির্দিষ্ট কারণে ব্যভিচার বলেন, সেই কারণটি আমরা এভাবেই সরিয়ে ফেলি।
মথি ১৯:৩-১০-এ যিশু মথি ৫:৩১-৩২-এর একই শিক্ষা দিচ্ছেন। তবে মথি ১৯:৩-১০-এর সূত্রপাত হয়েছিল যিশুকে ফাঁদে ফেলার উদ্দেশ্যে ফরীশীদের করা এক প্রশ্ন থেকে: তাহারা তাঁহাকে বলে, তবে মোশি কেন ত্যাগপত্র দিতে ও স্ত্রীকে ত্যাগ করিতে আজ্ঞা দিয়াছেন? –মথি ১৯:৭। যিশু আরও উত্তর দিয়ে বললেন, …তোমাদের হৃদয়ের কঠিনতার জন্য মোশি তোমাদিগকে স্ত্রীদের ত্যাগ করিতে অনুমতি দিয়াছিলেন; কিন্তু আদিতে এরূপ ছিল না –মথি ১৯:৮।
মার্কেও লেখা আছে, কিন্তু সৃষ্টির আদিতে ঈশ্বর তাহাদিগকে পুরুষ ও স্ত্রী করিয়া নির্মাণ করিলেন। এই কারণেই মানুষ আপন পিতা ও মাতাকে ত্যাগ করিয়া আপন স্ত্রীর সহিত আসক্ত হইবে, এবং সেই দুই একাঙ্গ হইবে; অতএব তাহারা আর দুই নয়, কিন্তু একাঙ্গ। সুতরাং ঈশ্বর যাহার যোগ করিয়া দিয়াছেন, মানুষ তাহার বিচ্ছেদ না করুক –মার্ক ১০:৬-৯।
অতএব, বিবাহবিচ্ছেদ ও তার সমস্ত নিয়মকানুন হলো মানুষের দেওয়ানি আইন ব্যবহার করে সেই বন্ধনের অবসান ঘটানোর চেষ্টা, যা আদিতে স্বামী বা স্ত্রীর যেকোনো একজনের মৃত্যু পর্যন্ত স্থায়ী বলে বোঝা হয়েছিল।
বিচ্ছিন্ন বা বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া প্রথম বিবাহ পুনর্মিলিত হওয়া সম্বন্ধে বাইবেল কী শিক্ষা দেয়?
তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, তোমাদের হৃদয়ের কঠিনতার জন্য মোশি তোমাদিগকে স্ত্রীদের ত্যাগ করিতে অনুমতি দিয়াছিলেন: কিন্তু আদিতে এরূপ ছিল না –মথি ১৯:৮। এখানে যিশু তাঁর পিতার আদি অভিপ্রায় শিক্ষা দিচ্ছেন। ব্যবস্থায় মোশি শিক্ষা দিয়েছিলেন যে… কোনো পুরুষ যদি স্ত্রী গ্রহণ করিয়া তাহাকে বিবাহ করে, আর পরে যদি স্ত্রী তাহার স্বামীর চোখে অনুগ্রহ না পায়, কারণ স্বামী তাহার মধ্যে কোনো অশুচি বিষয় পাইয়াছে, তবে সে তাহার জন্য ত্যাগপত্র লিখিয়া তাহার হাতে দিয়া তাহাকে নিজের গৃহ হইতে বিদায় করুক। আর সে তাহার গৃহ হইতে বাহির হইয়া গেলে অন্য পুরুষের স্ত্রী হইতে পারে। পরে সেই দ্বিতীয় স্বামী যদি তাহাকে ঘৃণা করে, তাহার জন্য ত্যাগপত্র লিখিয়া তাহার হাতে দিয়া তাহাকে নিজের গৃহ হইতে বিদায় করে; অথবা সেই দ্বিতীয় স্বামী, যে তাহাকে স্ত্রী করিয়া গ্রহণ করিয়াছিল, যদি মারা যায়; তবে তাহার প্রথম স্বামী, যে তাহাকে বিদায় করিয়াছিল, তাহাকে পুনরায় স্ত্রী করিয়া গ্রহণ করিতে পারিবে না… –দ্বিতীয় বিবরণ ২৪:১-৪।
বিবাহবিচ্ছেদের অনুমতি ও শর্ত সম্বন্ধে এটাই মোশির শিক্ষা, যার ব্যাখ্যায় যিশু বলেছিলেন, তা ছিল তাদের হৃদয়ের কঠিনতার জন্য। যিশু আরও স্পষ্ট করে বলেছিলেন, কিন্তু আদিতে এরূপ ছিল না –মথি ১৯:৮।
যিরমিয়ও হয়তো দ্বিতীয় বিবরণ ২৪:১-৪-এ মোশির লেখার কথা উল্লেখ করছেন, যখন তিনি বলেন, তারা বলে, কোনো পুরুষ যদি আপন স্ত্রীকে ত্যাগ করে, আর সে তাহার নিকট হইতে চলিয়া গিয়া অন্য পুরুষের হয়, তবে সে কি আবার তাহার নিকটে ফিরিয়া যাইবে? সেই দেশ কি অত্যন্ত কলুষিত হইবে না? কিন্তু তুমি অনেক প্রেমিকের সহিত ব্যভিচার করিয়াছ; তথাপি আমার নিকটে ফিরিয়া আইস, ইহা সদাপ্রভু কহেন –যিরমিয় ৩:১। যিরমিয়ের ৩ অধ্যায়ের বাকি অংশে বলা হয়েছে, তারা অনুতপ্ত হলে ঈশ্বর তাদের ফিরিয়ে নেন। ঈশ্বর তাদের (১৩ পদে) “তোমার অপরাধ স্বীকার কর” (অনুতপ্ত হওয়ার) জন্য অনুরোধ করেন এবং বারবার ফিরে আসতে আহ্বান জানান (১৪ পদ থেকে)।
ঈশ্বর ইস্রায়েলকে তাঁর সঙ্গে পুনরায় সহভাগিতায় ফিরতে আহ্বান জানিয়েছিলেন—তার পাপ স্বীকার ও জীবনধারা পরিবর্তনের ভিত্তিতে। তিনি দ্বিতীয় বিবরণ ২৪:১-৪-এ মোশির দেওয়া নির্দেশের দিকে মনোযোগ দেননি, কারণ “আদিতে এরূপ ছিল না।”
যিরমিয় ৩:৮-এ প্রভু তাকে (ইস্রায়েলকে) ত্যাগ করে ত্যাগপত্র দিয়েছিলেন। কিন্তু ১ ও ১২ পদে তিনি তাকে ফিরে আসতে আহ্বান করেন, আর ১৪ পদে পুনর্মিলনের শর্ত দেন। মালাখিতে লেখা আছে, যিহূদা বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে, এবং ইস্রায়েলে ও যিরূশালেমে ঘৃণার্হ কাজ করা হইয়াছে; কারণ যিহূদা সদাপ্রভুর পবিত্রতা, যাহা তিনি ভালবাসেন, অপবিত্র করিয়াছে, এবং বিজাতীয় দেবতার কন্যাকে বিবাহ করিয়াছে –মালাখি ২:১১।
ঈশ্বরের ইস্রায়েলকে ত্যাগ করা এবং পরে ইস্রায়েলের কোনো বিজাতীয় দেবতার সঙ্গে পুনর্বিবাহ—কোনোটিই তাদের প্রথম বিবাহে ফিরে আসার পথে বাধা হয়নি। বরং তারা অনুতপ্ত হলে প্রভু তাদের ফিরে আসতে আহ্বান জানিয়েছিলেন, যিরমিয় ৩:১৩-১৪। দ্বিতীয় বিবরণ ২৪ অধ্যায়ের সময় থেকে পুরাতন নিয়মের অধিকাংশ সময় পর্যন্ত বিবাহবিচ্ছেদ ছিল স্বীকৃত ও প্রচলিত; মানুষ তার ওপর কিছু নিয়মকানুন আরোপ করার চেষ্টা করছিল, “কিন্তু আদিতে এরূপ ছিল না।”
হোশেয় গ্রন্থে বিচ্ছিন্ন বা বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া প্রথম বিবাহের পুনর্মিলনের একটি বাইবেলীয় উদাহরণ রয়েছে: … সদাপ্রভু হোশেয়কে কহিলেন, যাও, ব্যভিচারিণী এক নারীকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ কর এবং ব্যভিচারজাত সন্তানদের গ্রহণ কর; কেননা দেশ সদাপ্রভুকে ত্যাগ করিয়া মহাব্যভিচার করিয়াছে –হোশেয় ১:২ (হোশেয় ২:৫-ও দেখুন)।
হোশেয় তাকে বিয়ে করার কিছু সময় পর সে “বেশ্যার” জীবনযাপনে ফিরে যায় (হোশেয় ৩:৩) এবং অন্য “প্রেমিকদের” অনুসরণ করে (২:৭)। সে যখন হোশেয়কে “আমার প্রথম স্বামী” বলে উল্লেখ করে (২:৭), তখন তা এই প্রমাণ দেয় যে হোশেয়কে ছেড়ে যাওয়ার পর সে সম্ভবত পুনর্বিবাহ করেছিল। (২:১৪) হোশেয় ধৈর্য ধরে “তাকে আকৃষ্ট করে এবং সান্ত্বনার কথা বলে” (২:১৯-২০), তাকে আবার বিবাহের প্রতিশ্রুতি দেয়; আর গোমের দৃশ্যত (২:২০) “বিশ্বস্ততায়” সাড়া দেয় এবং “প্রভুকে জানতে” আসে। (৩:৩) শেষ পর্যন্ত হোশেয় ও গোমের পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার অঙ্গীকার নিয়ে পুনর্মিলিত হয়।
ঈশ্বর-নির্ধারিত প্রাথমিক অঙ্গীকারে ফিরে আসাই লক্ষ্য; পুনর্মিলন হলো প্রক্রিয়া, আর প্রভুর সামনে অনুতপ্ত হৃদয় নিয়ে তাঁর করুণা ও ক্ষমা চাওয়াই হলো উপায় (হোশেয় ৩:৫ দেখুন)।
যোহন ৪:১-৪২ এমন একটি শাস্ত্রাংশ, যাকে কেউ কেউ বিচ্ছেদ বা বিবাহবিচ্ছেদের পর প্রথম বিবাহের পুনর্মিলনের বিরোধিতা বলে ব্যাখ্যা করেন, কারণ যিশু সেই নারীকে এই উত্তর দিয়েছিলেন। সে বলেছিল, …আমার স্বামী নাই। যীশু তাহাকে কহিলেন, তুমি ভালই বলিয়াছ, আমার স্বামী নাই; কেননা তোমার পাঁচটি স্বামী হইয়াছে, এবং এখন তোমার যাহা আছে, সে তোমার স্বামী নয়; এই কথা তুমি সত্য বলিয়াছ –যোহন ৪:১৭-১৮।
কেউ কেউ যিশুর কথার অর্থ এভাবে ব্যাখ্যা করবেন: “নারী, তুমি ঠিকই বলেছ, তোমার আগের পাঁচ স্বামীর কেউই—যাদের সঙ্গে তোমার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে বা যাদের তুমি ত্যাগ করেছ (প্রথমজনসহ)—তোমার স্বামী নয়; আর এখন যার সঙ্গে তুমি আছ, সেও তোমার স্বামী নয়। কোনো কোনো ভাষ্যকার ও অন্যরা এই নারীকে পাঁচবার বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া নারী এবং বর্তমানে বিবাহ ছাড়া একজন পুরুষের সঙ্গে বসবাসকারী বলে উল্লেখ করেন। তবে এই বিবরণে এই নারী অপবিত্র জীবনযাপন করছিল—এমন কোনো প্রমাণ আমি পাই না।
এই ঘটনার মাধ্যমে যিশুর উদ্দেশ্য ছিল সেই নারীকে এবং শিখর নগরের আরও অনেককে “মশীহ” হিসেবে এবং “জীবন্ত জল” নিয়ে নিজের পরিচয় প্রকাশ করা। পাপের মুখোমুখি হলে যিশু সাধারণত যেমন দোষ ধরতেন বা সংশোধন করতেন, তেমন কিছুই তিনি এখানে বলেননি। পাঁচ স্বামীর সবাই হয়তো মারা গিয়েছিলেন, আর এখন যাকে সে দেখছিল সে হয়তো কেবল বন্ধু—সম্ভবত বিয়ের আশায়। আমরা জানি না, কারণ বিবরণে বলা নেই; তবে তাকে শহরের একজন সম্মানিত ও প্রভাবশালী নারী বলে মনে হয়, যা অনৈতিকতার চলমান বদনাম থাকলে হওয়ার সম্ভাবনা কম। যিশু নিশ্চয়ই তাঁর জীবন্ত জল দেওয়ার সময় তার পাপ সম্পর্কে তাকে কিছু বলতেন। অতএব, এই বিবরণ ব্যবহার করে বলা যে পাঁচ স্বামীই ব্যভিচারী এবং ঈশ্বরের নথিতে এখনও স্বামী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ—তা শাস্ত্রের বাকি অংশের সঙ্গে মেলে না। সেই ব্যাখ্যা এই উক্তির প্রেক্ষাপটের সঙ্গেও মেলে না: এখন তোমার যাহা আছে, সে তোমার স্বামী নয়। কোনো জানা বাইবেলীয় প্রমাণ ছাড়া এই গল্পটি অনৈতিক জীবনযাপনের চিত্র—এমন দাবি করা শাস্ত্রে “যোগ করা” বা “তা থেকে কিছু বিয়োগ করার” কাছাকাছি। (প্রকাশিত বাক্য ২২:১৮ দেখুন)
উপসংহারে… বর্তমান পৃথিবীতে এবং অতীত ইতিহাসে মানুষ বিবাহবিচ্ছেদের পরবর্তী বিবাহগুলোকে প্রাথমিক বিবাহ-নিয়মের সমান মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এতে প্রাথমিক বিবাহ-নিয়মের ওপর ঈশ্বর যে গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য আরোপ করেছেন, তা অস্পষ্ট হয়েছে। ঈশ্বরের বাক্য শিক্ষা দেয় যে ঈশ্বর-আশীর্বাদপ্রাপ্ত যেকোনো প্রাথমিক অঙ্গীকার পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রভু সর্বদা অনুতাপকে মর্যাদা দিয়েছেন। কোনো সংগ্রামরত সম্পর্কের পুনর্মিলনকে আশীর্বাদ ও সফল করতে প্রভু চান—নম্রতা ও অনুতাপে ভরা ভগ্ন, অনুতপ্ত আত্মা এবং সমর্পিত মনোভাব।
১ করিন্থীয় ৭:১০-১৬-এর প্রেক্ষাপট হলো, একজন বিশ্বাসীর অবিশ্বাসী স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে অঙ্গীকারবদ্ধ সম্পর্কে থাকা। ১৫ পদে, অবিশ্বাসী স্বামী বা স্ত্রী চলে গেলে থেকে যাওয়া বিশ্বাসী সঙ্গী বিবাহ-সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য নিজের বিশ্বাসের পথ ত্যাগ করতে বাধ্য নন; তবে তিনি পুনর্বিবাহ করতেও মুক্ত নন (১১ পদ)। ১৫ পদ যদি বিবাহ-অঙ্গীকারের কথা বলে, তবে ৩৯ পদ ১৫ পদের এবং শাস্ত্রের বাকি অংশ অনুযায়ী ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরোধিতা করবে (মথি ১৯:৫ এবং ১ করিন্থীয় ৭:১০ দেখুন)। আলাদা থাকা পরিবারের ওপর প্রভাব সীমিত করে এবং সমাজের কাছে নেতিবাচক সাক্ষ্য হয়; তাই “প্রাথমিক বিবাহের অঙ্গীকারের” প্রতি বিশ্বস্ত থেকে থাকার মাধ্যমেই বিশ্বাসী স্বামী বা স্ত্রী প্রভুর জন্য অনেক বেশি প্রভাব ফেলবেন—যত কঠিনই হোক না কেন।
ঈশ্বরের বাক্য প্রাথমিক বিবাহ-অঙ্গীকারকে একান্তভাবে বাধ্যতামূলক ও সম্মানযোগ্য বলে ধরে। স্বামী বা স্ত্রী—যে কেউ জীবিত থাকাকালে করা পরবর্তী বিবাহের যেকোনো অঙ্গীকারকে আমাদের প্রভু কামনা ও ব্যভিচারের পাপ বলে গণ্য করেন; ঈশ্বরের ক্ষমা চাইতে হলে এর জন্য অনুতপ্ত হতে হবে।
অতএব, উভয় স্বামী-স্ত্রীর অনুতাপ ও ক্ষমা, এবং তাদের ঈশ্বর-আশীর্বাদপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিবাহ-অঙ্গীকারে ফিরে গিয়ে তার মর্যাদা রক্ষা করার আকাঙ্ক্ষা—এ কোনো দৈহিক আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং পাপীর হৃদয়ের গভীরে পবিত্র আত্মার কাজ। ভগ্ন সম্পর্কের জন্য অনুতপ্ত হয়ে পুনর্মিলনের ঈশ্বরভক্ত আকাঙ্ক্ষা যখন থাকে, তখন সেই পুনর্মিলনের সমর্থনে এবং আমাদের স্বর্গীয় পিতার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতায় আমাদের নতজানু হওয়া উচিত।
নম্রতা ও অনুতাপের মাধ্যমে ক্ষমা চায়—এমন সংগ্রামরত সম্পর্কগুলোর মাঝে এসে সেগুলো পুনরুদ্ধার করার প্রস্তাব যিশু দিয়েছেন; এর ফলে তারা আবার তাদের প্রভুর পূর্ণ সেবায় ফিরবে এবং অনন্ত আনন্দ লাভ করবে। তিনি বলেন: কেননা যেখানে দুই কি তিন জন আমার নামে একত্র হয়, সেখানে আমি তাহাদের মধ্যে আছি –মথি ১৮:২০। আর পৌল বলেন, আর যিনি যীশুকে মৃতগণের মধ্য হইতে উঠাইয়াছেন, তাঁহার আত্মা যদি তোমাদিগেতে বাস করেন, তবে যিনি খ্রীষ্টকে মৃতগণের মধ্য হইতে উঠাইয়াছেন, তিনি তোমাদের মর্ত্য দেহকেও তোমাদিগেতে বাসকারী আপন আত্মা দ্বারা জীবিত করিবেন –রোমীয় ৮:১১।

