আমি ঘরে বসে বিশ্বকোষ পড়ছিলাম, এমন সময় নুড়ি-ঢালা পথ দিয়ে ট্রাকের টায়ার চলার ঘর্ষণের শব্দ চারদিক ভরিয়ে দিল। লাফিয়ে উঠে জানালা দিয়ে উঁকি দিলাম।
মা কিছু পীচ নিয়ে লুইসবার্গের ফল-সবজির নিলাম থেকে এইমাত্র ফিরেছিলেন।
পেছনে দরজা সজোরে বন্ধ করে আমি ঘন সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে দৌড়ে গেলাম এবং আমাদের ট্রাকের পেছনের অংশে লাফিয়ে উঠলাম।
পিকআপ ট্রাকের পেছনে পীচের চারটি বাক্স রাখা ছিল। বিজয়ীর হাসি হেসে আমি একটি বাক্সে হাত ঢুকিয়ে পাকা পীচ খুঁজতে লাগলাম। সেটিতে কামড় বসানোর ঠিক আগে মা বললেন, “স্টিভেন, পীচ খেয়ো না; তাহলে তোমার রাতের খাবার নষ্ট হয়ে যাবে।” মন খারাপ করে পীচটি আবার বাক্সে ফেলে ধীরে ধীরে সেখান থেকে চলে গেলাম।
কয়েক ঘণ্টা পর বাবা বাছুরের খামার থেকে ডাকলেন। “স্টিভেন, শুক্রবারের বাজারে আমাদের ফল-সবজির স্টলের জন্য মূলাগুলো তুলে আনো।”
মূলাগুলো তোলা, ধোয়া ও আঁটি বাঁধার পর সেগুলো লাল গোয়ালঘরের ভেতরে থাকা পুরোনো শীতলঘরে নিয়ে গেলাম। জোরে টানতেই শীতলঘরের দরজাটা কিঁচকিঁচ করে খুলে গেল। শীতলঘরের দেয়ালঘেঁষে রাখা ছিল সেই চার বাক্স লোভনীয় পীচ। আমি পীচগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম, মুখে জল এসে গেল। তাড়াতাড়ি মূলাগুলো নামিয়ে রাখলাম। আহা, কী সুন্দরই না দেখাচ্ছিল সেগুলো! নিশ্চিতভাবেই, সামান্য একটু পীচ দশ বছরের ক্ষুধার্ত ছেলেটার রাতের খাবার নষ্ট করবে না। আমি শুধু একটা পীচ নিলে মা তো জানতেও পারবেন না।
মনের গভীরে ভালো আর মন্দের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব শুরু হতে লাগল। আমি জানতাম, লুকিয়ে খাওয়া ভুল, কিন্তু পীচগুলো দেখতে ভীষণ লোভনীয় লাগছিল।
পীচটি গোগ্রাসে খেয়ে নিয়ে, আঁটিটি লুকোনোর ভালো জায়গা খুঁজতে গোয়ালঘরের অন্ধকার ভেতরটা চোখ বুলিয়ে দেখলাম। শুকানোর মাচায় রাখা পেঁয়াজগুলোর ওপারে খোলা খড়ের গাঁটটির দিকে তাকালাম। সমস্যা ছিল, আঁটিটি খড়ের নিচে রাখলে কেউ সেটি খুঁজে পেতে পারে। তখন গোয়ালঘরের পশ্চিম পাশের দেয়ালের তক্তাগুলোর ফাঁকফোকর চোখে পড়ল। ওই ফাঁকগুলোর একটির ভেতর দিয়ে আঁটিটি ঠেলে দিলে সেটি রাস্তার পাশে পড়বে। তারপর কেউ সেটি দেখলে ভাববে, কোনো পাশ দিয়ে যাওয়া যানবাহন থেকে পড়েছে।
আমি আঁটিটি ফাঁকের ভেতর গুঁজে দিলাম, আর সেটি রাস্তার পাশে পড়ার সময় বাইরে উঁকি দিয়ে দেখলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে কপালে তীব্র জ্বালাপোড়ার মতো ব্যথা অনুভব করলাম। আতঙ্কে আমি লাফিয়ে পিছিয়ে গেলাম। ফাঁকের ঠিক ওপরে ঝুলছিল হলুদ জ্যাকেট বোলতার বাসা। তারপর অপরাধীটিকে দেখতে পেলাম—সেটি আমার মাথার ওপর ভনভন করে উড়ছিল, আবার হুল ফোটানোর চেষ্টা করছিল। আমি গোয়ালঘরের দরজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গিয়ে দরজাটা সজোরে হলুদ জ্যাকেট বোলটার গায়ে লাগিয়ে দিলাম।
সেই সন্ধ্যায় আমার কপাল বেলুনের মতো ফুলে উঠল, ফলে চোখ মেলে তাকানো কঠিন হয়ে পড়ল।
কয়েক ঘণ্টা পর অন্য সবাই বিছানায় গেল। আমি সোফায় শুয়ে রইলাম, যাতে মা রাতে মাঝেমধ্যে এসে আমার খোঁজ নিতে পারেন। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছিল না। আমার মুখ ফুলে লাল হয়ে চুলকাচ্ছিল, কিন্তু আমি শুধু যা করেছি তার অপরাধবোধ আর অনুশোচনার কথাই ভাবতে পারছিলাম।
কয়েক ঘণ্টা যন্ত্রণায় কাটানোর পর, সাহস সঞ্চয় করে সোফা থেকে নেমে পা টিপে টিপে বাবা-মায়ের শোবার ঘরের দিকে গেলাম। বাবা-মাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে পুরো ঘটনাটা বললাম… কীভাবে পীচ খেয়েছিলাম, তারপর কীভাবে আঁটিটি লুকোনোর চেষ্টা করেছিলাম, আর কীভাবে হুল ফুটেছিল।
বাবা-মা আমাকে ক্ষমা করলেন; তাঁরা ঠিক করলেন, এই শিক্ষা আমি শিগগির ভুলব না। মনটা হালকা হয়ে সোফায় ফিরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম, আর দ্রুতই শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লাম।



