একটি পদ আমার দৃষ্টি সব সময়ই আকর্ষণ করেছে, আর সেটি পড়লে আমার শিরদাঁড়া শিহরিত হয়—মথি সপ্তম অধ্যায়ে পাওয়া যায় এই পদটি। সেই দিন অনেকে আমাকে বলবে, প্রভু, প্রভু, আমরা কি তোমার নামে ভাববাণী বলিনি? তোমার নামে কি ভূত তাড়াইনি? তোমার নামে কি অনেক আশ্চর্য কাজ করিনি? –মথি ৭:২২।
যিশু আমাদের একদল লোকের ছবি দেখান, যারা বিচারদিনে তাঁর সামনে দাঁড়াবে। তারা মনে করত, তারা তাঁর জন্যই জীবন যাপন করেছে। তারা ছিল প্রতিভাবান মানুষ—যিশুর নামে ভাববাণী বলত, ভূত তাড়াত এবং অনেক আশ্চর্য কাজ করত—তাদের দেখে ভালো খ্রিষ্টান বলেই মনে হতো। কিন্তু পরের পদে আমরা পড়ি, যিশু তাদের বলবেন যে তিনি তাদের কখনোই চিনতেন না। যিশু তাদের তাঁর কাছ থেকে চলে যেতেও বলেন। তিনি তাদের চিরকালের জন্য নরকে পাঠান।
এই পদগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয় এমন একটি ঘটনা আমার মনে পড়ে। বহু বছর আগে আমি একটি স্টিল জয়েস্ট কোম্পানিতে কাজ করতাম। এক সাধারণ শুক্রবারের সকাল ছিল; আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে যেমনটা প্রত্যাশিত ছিল, আমরা কঠোর পরিশ্রম করছিলাম। শিফট শেষ হলে পুরো কারখানার সবাইকে নিয়ে একটি সভা হবে—লাইন বস এসে তা ঘোষণা করলেন। সভাটি কী নিয়ে, তা ভেবে আমরা সবাই অবাক হলাম। আমরা খোঁজখবর নিলাম, কিন্তু মনে হলো কেউই জানে না। শিফটের পর আমরা সবাই একটি বড় বৃত্তে দাঁড়িয়ে বসের জন্য অপেক্ষা করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি আরেকজন লোককে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তিনি ছিলেন পুরো কোম্পানির ম্যানেজার। ওই লোকেরা আসার আগে আমরা সবাই অনানুষ্ঠানিকভাবে কথাবার্তা বলছিলাম, হাসাহাসি হচ্ছিল, গলার স্বরও ছিল বেশ চড়া। বসের হাতে ছিল খামের বড় একটি স্তূপ, আর আমি শুনলাম চারদিকে বোনাসের চেক নিয়ে গুঞ্জন উঠেছে। বস ছাড়া সবাইকে উত্তেজিত দেখাচ্ছিল।
তারপর বস কথা বলতে শুরু করলেন, “গত চার সপ্তাহ ধরে আমরা তোমাদের সবাইকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছি। তোমাদের কাজের মনোভাব, তোমরা কতটা চেষ্টা করো, আর সময়মতো আসো কি না—এসব দেখেছি। আরও অনেক দিক আমরা বিবেচনা করেছি। তোমাদের তত্ত্বাবধায়কেরা প্রত্যেককে তোমাদের নাম লেখা একটি খাম দেবেন। কারখানার সীমানার বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত এই চিঠি খুলবে না। খুললে তাতে কিছু নির্দেশনা পাবে। বেশির ভাগের ক্ষেত্রে লেখা থাকবে, সোমবার স্বাভাবিক সময়ে কাজে ফিরতে হবে। কিন্তু তোমাদের ২৭ জনের ক্ষেত্রে লেখা থাকবে যে তোমাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তোমরা যারা এই সংখ্যার মধ্যে পড়েছ, মূল্যায়নের সময় আমরা যা দেখেছি তা আমাদের পছন্দ হয়নি, তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে এখানকার চাকরি থেকে তোমাদের অব্যাহতি দিতে হবে।”
সুঁই পড়লেও তার শব্দ শোনা যেত। প্রত্যেকের মুখে ভয় ফুটে উঠেছিল। আমার মনে আছে, ইচ্ছে হচ্ছিল যদি আরও কঠোর পরিশ্রম করতাম, আরও বেশি জড়িত থাকতাম। নিজের চাকরিটাকে হেলায় নেওয়ার জন্য অনুতপ্ত হচ্ছিলাম। ভীষণ খারাপ লাগছিল; সেখানে আমি বহু বছর কাজ করেছি, কিন্তু তাতে কি কিছু এসে যায়?
সেদিন আমাকে বরখাস্ত করা হয়নি, কিন্তু অন্য ২৭ জনকে করা হয়েছিল। তারা ভেবেছিল, যথেষ্ট করেছে। ভেবেছিল, যেহেতু তারা নির্দিষ্ট সময় ধরে কাজ করেছে, তাই তারা নিরাপদ। কিন্তু তারা ভুল ছিল, আর এখন আর কিছুই করার ছিল না। সব শেষ।
আমাদের কী হবে? অনন্তকালকে সামনে রেখে কি আমরা ঈশ্বরের সঙ্গে আমাদের চলার পথের মূল্যায়ন করি? বিচারদিনে কী ঘটবে, তা কি আমরা ভাবি? আমরা কীভাবে জানতে পারি?
যিশু এর কয়েকটি পদ আগেই বলেন, আমরা একে অপরকে ফলের দ্বারা চিনব। ঈশ্বরের বাক্যে ফলের বিষয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। গাছের ফল পরীক্ষা করে আমরা বুঝতে পারি গাছটি কী ধরনের। আমরা যখন প্রথম হাইতিতে চলে এলাম, সেখানে কী কী ধরনের গাছ আছে তা জানতাম না। আমাদের জমির একটি বড় গাছের দিকে তাকিয়ে আমি মনে মনে ভাবতাম, সেটি কী গাছ। তারপর একটি জিনিস দেখে তা বুঝতে পারলাম। তার ডালে ছোট ছোট অ্যাভোকাডো ঝুলছিল। আজকের মণ্ডলীতে মনে হয়, মানুষ এ বিষয়ে কথা বলতে চায় না। কিন্তু আমি নিশ্চিত করে বলছি, চিরকালের জন্য দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের এ বিষয়ে কথা বলা উচিত। পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, কারখানায় কিছু কর্মচারীকে বরখাস্ত করার সেই দিনের আগে আমরা এ বিষয়ে কথা বলতে পারলে খুব ভালো হতো।
তাহলে, খ্রিষ্টানের ফল কী? আমরা জানি, ভালো মানুষ হওয়া এবং নির্দিষ্ট ধরনের পোশাক পরা ঈশ্বরভক্ত জীবনের নির্ধারক বিষয় নয়। আমরা কোন মণ্ডলীতে যাই, কোন পরিবারে জন্মেছি, আমাদের সংস্কৃতি কী, কিংবা আমাদের গায়ের রং কী—এসবও নয়। অনেকেই একমত হবেন যে এসব বিষয় আমাদের খ্রিষ্টান হিসেবে পরিচিত করে না। কেউ কেউ হয়তো মনে করেন, খ্রিষ্টানের ফল হলো ভালো, নৈতিকভাবে সৎ এবং সমাজের একজন প্রেমময় নাগরিক হওয়া। অনেকেই আইন মেনে চলেন, প্রেমময় ও শান্তিপ্রিয়, নিজেদের প্রয়োজন এবং অন্যদের প্রয়োজন মেটান। তবু তাদের পক্ষে এসব ভালো কাজ করেও নরকে যাওয়া সম্ভব।
আমরা জগৎকে (এবং মণ্ডলীর কিছু লোককে) জোর গলায় ঘোষণা করতে শুনি যে কেবল হৃদয়টাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি, দৃশ্যমান ফলের অভাবকে অজুহাত দেখানোর জন্যই তারা এ কথা বলে। তাদের বাইরের অবস্থা খারাপ হলেও তারা চায় মানুষ ভাবুক, তাদের হৃদয় ভালো, আর আসলে সেটাই কেবল গুরুত্বপূর্ণ।
হৃদয় গুরুত্বপূর্ণ—এ কথা তারা ঠিকই বলে। হৃদয় যখন স্বার্থপর ও দুষ্ট থাকে, তখন কেবল বাহ্যিক রূপ ধারণ করে কোনো কিছুই বদলানো বা ঠিক করা যায় না। কিন্তু হৃদয় ভালো আর বাইরের দিকটা খারাপ—এ বিষয়ে তারা ভুল। এটা অসম্ভব। যিশু বলেন, হে অন্ধ ফরীশী, প্রথমে পেয়ালা ও থালার ভেতরটা পরিষ্কার কর, যাতে সেগুলোর বাইরেটাও পরিষ্কার হয় –মথি ২৩:২৬।
তোমার হৃদয় পরিষ্কার অথচ চেহারা পাপময়—এটা হতে পারে না। কিন্তু উল্টো দিক থেকে, তোমার বাহ্যিক চেহারা পরিষ্কার হলেও হৃদয় ঈশ্বরভক্তিহীন হতে পারে। তাহলে আমরা কীভাবে বুঝব? যিশু যে ফলের কথা বলছেন, তা কী?
আমরা শিগগিরই আত্মার ফল নিয়ে কথা বলব, তবে তার আগে আমি এমন আরেকটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই, যা আমার বিশ্বাস, একজন খ্রিষ্টানকে চিহ্নিত করে। এমন কিছু, যা ভেড়া আর নেকড়েকে আলাদা করতে পারে, এমনকি দেখতে যদি তাদের একই রকম মনে হয়।
যিশুর সেবা করার আকাঙ্ক্ষা। ঈশ্বর যখন কোনো মানুষের আত্মাকে রূপান্তরিত করেন, সেই ব্যক্তি নতুন সৃষ্টি হয় এবং তার সমগ্র সত্তা দিয়ে ঈশ্বরের সেবা করার আকাঙ্ক্ষা করে। ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করে এমন কাজ করতে তাকে জোর করতে হয় না। আজকাল মণ্ডলীতে কাঠামো ও নিয়মকানুন নিয়ে অনেক কথা হয়, কিন্তু সব সময় এমন ছিল না। তাহলে আজ এটি এত বড় সমস্যা কেন? হয়তো মণ্ডলীতে এমন লোক আছে যারা রূপান্তরিত হয়নি। হয়তো কেউ কেউ অতিরিক্ত স্বাধীনচেতা, কী করতে হবে তা শুনতে চায় না। তুমি মণ্ডলীর কোনো সদস্যকে শালীনভাবে পোশাক পরতে বলতে পারো, কিন্তু তার হৃদয় যদি পরিবর্তিত না হয়, তবে সমস্যায় পড়বে। তারা যতটা সম্ভব জাগতিক হওয়ার চেষ্টা করবে, আবার মণ্ডলীর ‘নিয়মের’ মধ্যে থাকবে। অথবা তারা তা করতে সরাসরি অস্বীকার করবে, আর মণ্ডলী শিগগিরই নতি স্বীকার করে তার লোকদের শালীনভাবে পোশাক পরতে ও জীবনযাপন করতে আর বাধ্য করবে না। মণ্ডলীর কি তার লোকদের শালীন হতে বাধ্য করা উচিত? মণ্ডলীর কি তার লোকদের খ্রিষ্টসদৃশ হতে বাধ্য করা উচিত? একেবারেই না। কোনো আত্মা যখন খ্রিষ্টের রক্তে মুক্ত ও রূপান্তরিত হয়েছে, তখন সেই ব্যক্তি তার পরিবর্তিত স্বভাবের কারণে প্রতিদানে তাঁর জন্য আত্মত্যাগের জীবন যাপন করবে। কৃতজ্ঞ হৃদয়ে আমরা তাঁর আজ্ঞা পালন করি!
কারণ ঈশ্বরের প্রতি প্রেম এই যে, আমরা তাঁর আজ্ঞা পালন করি; আর তাঁর আজ্ঞাগুলি ভারী নয় –১ যোহন ৫:৩।
ঈশ্বরের আত্মা যার হৃদয়কে নতুন করেনি, সে আবেগভরে ঈশ্বরের জন্য জীবন যাপন করতে চাইবে না। কেউ ধর্মীয়ভাবে নিয়মিত মণ্ডলীতে যেতে পারে—অনেক অবিশ্বাসী নিয়মিত মণ্ডলীর উপাসনায় যোগ দেয়। কেউ ঠিকমতো পোশাক পরতে ও ঠিকমতো আচরণ করতে পারে, কিন্তু তার হৃদয় যদি ঈশ্বরের বিষয়গুলোর জন্য হাহাকার না করে, তবে এসবের কোনো লাভ হবে না। তারা যা করে তার অনেকটাই ঈশ্বরের মহিমার জন্য নয়, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য। আজকের বহু মণ্ডলী যে অবক্ষয়কে মেনে নিচ্ছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
কাউকে সত্যিই ঈশ্বরের জন্য জীবন যাপন করতে আকাঙ্ক্ষী হতে দেখা এক অপূর্ব ব্যাপার। তারা তাদের সৃষ্টিকর্তা, তাদের ত্রাণকর্তার মুখ অন্বেষণ করতে চায়। তারা রাজ্যের জন্য, ভ্রাতৃত্বসমাজের জন্য জীবন যাপন করে। ঈশ্বরের আজ্ঞা পালন ও তাঁর সেবা করা তাদের কাছে অপরিহার্য; তাদের কাছে সত্যিই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটাই। তারা সত্যিই তাদের ‘সবকিছু’ বেদিতে উৎসর্গ করেছে। তারা বাক্য পড়তে এবং ঈশ্বরের সঙ্গে একান্ত সময় কাটাতে ভালোবাসে। তাদের আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছা তাদের ঈশ্বরের বেদিতে উৎসর্গ করা হয়েছে।
লোকেরা আমাকে বলেছে, নতুন খ্রিষ্টানকে একটু সময় দেওয়া দরকার। “কিসের জন্য একটু সময়?” আমি জিজ্ঞেস করি। পাপের জন্য… দৈহিক প্রবৃত্তির জন্য? একেবারেই না। বাইবেলের প্রতিটি উদাহরণ এর বিপরীত কথা বলে। প্রতিটি রূপান্তরেই এসেছে বিরাট পরিবর্তন, এক নতুন সৃষ্টি। অনেকেই বিশ্বাসে ‘শেখা ও বেড়ে ওঠার জন্য অনুগ্রহ’কে ‘পাপের অজুহাত’ বলে ভুল করেন। শাস্ত্র নতুন খ্রিষ্টানদের বর্ণনা করে… নবজাত শিশুর মতো, এবং আমাদের প্রত্যেককে আদেশ করে, যেন তোমরা তার দ্বারা বৃদ্ধি পাও, সেই উদ্দেশ্যে বাক্যের নির্ভেজাল দুধের আকাঙ্ক্ষা করো: –১ পিতর ২:২। তাই নতুন খ্রিষ্টানদের কিছু সময়ের জন্য তাদের অধার্মিক পথে চলতে থাকার সুযোগ দরকার নেই; তবে বেড়ে ওঠার জন্য তাদের সুযোগ দরকার …জ্ঞান ও বয়সে এবং ঈশ্বর ও মানুষের কাছে অনুগ্রহে –লূক ২:৫২।
কেউ যখন এসে ঘোষণা করে যে সে রূপান্তরিত হয়েছে, তা সহজেই বোঝা যায়। আমরা কেবল এমন কিছু শাস্ত্রপদ আলোচনা করি, যেগুলো অসাংসারিকতা, প্রতিরোধ না করা এবং এ ধরনের মৌলিক, ব্যবহারিক মতবাদ ব্যাখ্যা করে। কেউ কেউ সেগুলোকে ঈশ্বরের বাক্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং গভীরভাবে অন্তরে ধারণ করে। আমি যখন তাদের এমন পদ পড়ে শোনাই—যে শাস্ত্রপদ তারা আগে কখনো শোনেনি—তখন অনেকেই বিস্ময়ে বসে থাকে। সাধারণত তারা ঈশ্বরের বাক্য থেকে এইমাত্র যা শুনেছে, তা বিশ্বাস করে, আর তা তাদের বদলে দেয়। এই হলো এমন একজন খ্রিষ্টান, যে শিক্ষা পেতে, শিষ্যত্বে গড়ে উঠতে চায়। তারা সাধারণত শেখার আগ্রহী মনোভাব নিয়ে আসে, ঈশ্বরের বাক্যে যা পড়েছে অথচ বোঝেনি, সে বিষয়ে প্রশ্ন করে।
কিন্তু আরও অনেকের ক্ষেত্রে কী হয়? তারা সেই একই শাস্ত্রপদ শোনে এবং তর্ক করে—তারা বাইবেলের সঙ্গে তর্ক করে, আর যে ব্যক্তি তাদের শাস্ত্র থেকে তা জানাচ্ছে তার সঙ্গেও তর্ক করে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা ঈশ্বরের সঙ্গেই তর্ক করছে। সাধারণত তারা স্বীকার করে যে বাইবেলে এ কথাই বলা আছে, কিন্তু জানতে চায়, কেন তা বলা হয়েছে। তারা ঈশ্বরের জন্য নিজেদের জীবন পরিবর্তন করতে চায় না। তারা খ্রিষ্টান হতে চায়, হ্যাঁ, কিন্তু নিজেদের ইচ্ছেমতো জীবনও যাপন করতে চায়। ঈশ্বরের আজ্ঞা পালন করার আকাঙ্ক্ষা তাদের নেই। আমরা তাদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে পারি, কিন্তু বিষয়টি স্পষ্ট: তাদের হৃদয় জগতের বিষয় ও এই জীবনের ভোগবিলাসের জন্য হাহাকার করে।
আমার সঙ্গে কল্পনা করুন, এক হাজার বছর আগে বেঁচে থাকা একজন মানুষকে। তাকে একটি অন্ধকূপে বন্দি করে রাখা হয়েছে, যেখানে সবকিছু কয়লার মতো কালো। জায়গাটা স্যাঁতসেঁতে ও দুর্গন্ধময়। সুসমাচার প্রচার করার অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ছোট্ট কুঠুরিতে তাকে বেঁধে রাখা বড়, ভারী শিকল তার গোড়ালি ও কবজিতে ঘষে কাঁচা রক্তাক্ত ক্ষত করেছে। তার বদ্ধ জায়গায় দম বন্ধ হয়ে আসে, সে ক্লান্ত ও অবসন্ন। তার পিঠ রক্তাক্ত। ব্যথায় কাতর অঙ্গগুলো ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। সে ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলে, কিন্তু ঈশ্বর উত্তর দেন না। মুক্তির জন্য মিনতি করে, কিন্তু কোনো সাড়া পায় না। নিজের জীবন ও বিশ্বাসের কথা ভাবে। তারপর ভয়ংকর সেই প্রশ্নটি তার মনে জাগে: “ঈশ্বর, তুমি কি আছ? তুমি কি সত্যিই আছ?” নীরবতা। তার বিশ্বাস চরমভাবে পরীক্ষিত হচ্ছে। সে জানে, নিজের বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে থাকলে আগুন তার জন্য অপেক্ষা করছে। কেন? যে ঈশ্বর তাকে এই যন্ত্রণা ভোগ করতে দেন, তাঁর জন্য কেন মরবে? যে ঈশ্বর কথা বলেন না, তাঁর জন্য কেন মরবে? “আমার ঈশ্বর, আমার ঈশ্বর, তুমি কেন আমাকে পরিত্যাগ করেছ?”
এবার এই মানুষটিকে কল্পনা করুন… সে আপনি।
আমরা কি সত্যিই ঈশ্বরে বিশ্বাস করি—এমন এক ঈশ্বরে, যাঁকে দেখা যায় না এবং যাঁর কথা প্রায়ই শোনা যায় না? আমাদের বিশ্বাস যদি না থাকে, তাহলে যখন সত্যিই তাঁর প্রয়োজন হবে, ঈশ্বরও তখন থাকবেন না।
ঈশ্বর চান, আমরা সব সময় আমাদের সমস্ত বিশ্বাস তাঁর ওপর রাখি। আমরা বিশ্বাসের দ্বারা চলি, দৃশ্যের দ্বারা নয়… এমনকি সবকিছু ভালো চললেও। আমরা যখন ভয়াবহ সময়ের মধ্যে পড়ি, ঈশ্বর তখনও কাছে আছেন, আমাদের পথ দেখাচ্ছেন এবং এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিচ্ছেন! আমরা তাঁর ও তাঁর বাক্যের ওপর নির্ভর করতে অভ্যস্ত।
কারণ তারা যদি কাঁচা গাছে এসব করে, তবে শুকনো গাছের কী হবে? –লূক ২৩:৩১।
ঈশ্বর এমন হৃদয় ভালোবাসেন, যা তাঁর দিকে ফিরে আছে, সম্পূর্ণভাবে সমর্পিত ও তাঁর অধীন। যারা আন্তরিকভাবে তাঁকে অন্বেষণ করে, তিনি তাদের পুরস্কারদাতা!
আমাদের কি ঈশ্বরের আত্মার ফল আছে? আমরা কি খ্রিষ্টানদের মতো আচরণ করি? আমাদের কি খ্রিষ্টানদের মতো দেখায়?
একটি বড় মণ্ডলীতে প্রচার করার জন্য আমাকে অনুরোধ করা হয়েছিল, যেখানে আমি আগে কখনো যাইনি। পরিবার নিয়ে গিয়ে বসেছিলাম, আর শত শত মানুষের ভিড়ে আসনগুলো পূর্ণ হতে দেখলাম। এই লোকেরা কী পোশাক পরেছে দেখে আমি বিস্মিত হলাম। ছোট মিনিস্কার্ট ও খোলামেলা টপ, জাগতিক ফ্যাশন ও স্টাইলের ছড়াছড়ি। উপাসনা শুরু হলো, আর আমি দ্রুত বুঝতে পারলাম, আমার পরিবারের জন্য এটি ভালো জায়গা নয়; তাই তাদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে একা ফিরে এলাম। রক সঙ্গীত তখনও চলছিল, আর নাচ আমার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। দুই ঘণ্টা পর বাণী দেওয়ার সময় হলো। আমি দাঁড়িয়ে জনতাকে বললাম যে আমি আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট। মিলনায়তন হাসিতে ভরে উঠল। তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, তারা আমাকে বিশ্বাস করে কি না। “না!” তারা চিৎকার করে বলল। কেন বিশ্বাস করেনি, তা জিজ্ঞেস করলাম, আর তারা নানা উত্তর দিল। একজন চিৎকার করে বলল, “আপনাকে প্রেসিডেন্টের মতো দেখায় না, পোশাকও তেমন নয়!” আরেকজন বলল, “আপনি প্রেসিডেন্ট হলে এখানে থাকতেন না!” আরেকজন বলল, আমার কথা বলার ধরন প্রেসিডেন্টের মতো নয়। আমি তাদের বললাম, আমি বুঝতে পারছি না। জিজ্ঞেস করলাম, তারা কীভাবে বলতে পারে যে তারা খ্রিষ্টান—তাদের দেখতে খ্রিষ্টানের মতো নয়! তাদের আচরণ খ্রিষ্টানের মতো নয়! তাদের কথা খ্রিষ্টানের মতো নয়!—তবুও সবাই তাদের বিশ্বাস করে!
মনে হয়, খ্রিষ্টানদের ছাড়া সবকিছুরই আমরা ফল দেখে বিচার করি। খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা, তারা নিজেদের সম্পর্কে যা দাবি করে, তার ভিত্তিতে বিচার করা হবে। এই জগৎ মনে করে, যিশু কী চান তা তারা নিজেরা কল্পনা করলেই হবে, তারপর ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে পছন্দ, সেভাবেই তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারবে। কিন্তু বাইবেল স্পষ্ট বলে: তাদের ফল দ্বারাই তোমরা তাদের চিনবে। কাঁটাঝোপ থেকে কি লোকে আঙুর সংগ্রহ করে, অথবা শিয়ালকাঁটা থেকে ডুমুর? তেমনই প্রত্যেক ভালো গাছ ভালো ফল দেয়, কিন্তু পচা গাছ মন্দ ফল দেয়। ভালো গাছ মন্দ ফল দিতে পারে না, আর পচা গাছও ভালো ফল দিতে পারে না। যে গাছ ভালো ফল দেয় না, তা কেটে আগুনে ফেলে দেওয়া হয়। অতএব তাদের ফল দ্বারাই তোমরা তাদের চিনবে –মথি ৭:১৬-২০।
বাইবেল বলে, …আত্মার ফল হলো প্রেম, আনন্দ, শান্তি, দীর্ঘসহিষ্ণুতা, মাধুর্য, মঙ্গলভাব, বিশ্বাস, নম্রতা, আত্মসংযম… –গালাতীয় ৫:২২-২৩। তুমি আর আমি—মানুষ যখন আমাদের দেখে, তখন কি এসব বিষয়ই দেখতে পায়? আমি জানি, এসব ফলের এক বা একাধিক না থাকার পক্ষে অজুহাত দেওয়া সহজ; বলা যায়, “আমি এটা নিয়ে কাজ করছি,” অথবা “এ বিষয়ে প্রার্থনা করছি।” যিশু বলেননি যে খ্রিষ্টানদের এই ফল অর্জনের জন্য চেষ্টা করতে হবে। তিনি কেবল বলেন, এগুলো ঈশ্বরের অন্তর্নিবাসী আত্মার ফল, অর্থাৎ উৎপাদন। আমরা যদি জাগতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটি, অথবা জগতের সঙ্গে মিশে যেতে চাই, তাহলে আমাদের জীবনে এই ফল প্রকাশ পাবে বলে আশা করতে পারি না। আমার বিশ্বাস, এই ফল হলো একজন দুঃখভোগী মানুষের ফল—এমন একজন, যে নিজের সবকিছু দিয়েছে এবং নিহত মেষশাবকের জন্য নিজের সবকিছু দিতে চায়।
যে গাছ ভালো ফল দেয় না, তা কেটে আগুনে ফেলে দেওয়া হয় –মথি ৭:১৯।
আমরা যখন কোনো কাজে আমাদের সবটুকু দিই—সেটি কাজ হোক, পড়াশোনা হোক, অথবা পরিবার গড়ে তোলা—তখন ভালো লাগে, পরিতৃপ্তি আসে। ঈশ্বরের সেবা করতে যখন আমরা আমাদের সমগ্র সত্তা নিয়োজিত করি, তখনও একই কথা সত্য। তা থেকে গভীর তৃপ্তি আসে, এমন এক শান্তির অনুভূতি, যা সব বোধের অতীত।



