গ্রিক চিত্রকর আপেলেসকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি তাঁর ছবিগুলোর পেছনে এত শ্রম দেন কেন, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “কারণ আমি অনন্তকালের জন্য ছবি আঁকছি।” তিনি কথাটি সাহসী রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন; কিন্তু আমরা যখন বলি যে অনন্তকালের জন্য নিজেদের জীবনের ছবি আঁকছি, তখন কথাটি আক্ষরিক অর্থেই ব্যবহার করতে পারি। আমাদের ব্যবহৃত রং স্থায়ী। সেই ছবিতে যে পবিত্র ও নির্মল কথা বা কাজ আঁকা হবে, তা সেখানে অবিনশ্বর ও অমর হয়ে থাকবে। জীবনের সেই ক্যানভাসে যে স্বার্থপর বা পাপপূর্ণ বিষয় আঁকা হবে, তা কখনো মুছে ফেলা যাবে না—শুধু এই বর্তমান জীবনে যিশুর রক্ত প্রয়োগের মাধ্যমে তা সম্ভব। সেই মূল্যবান রক্ত এখনই, নয়তো কখনোই, কার্যকর। মৃত্যু এলে ছবি আঁকার কাজ থেমে যায়! তখন অনুতাপ বা বিশ্বাসের কোনো আঁচড় আর তাতে যোগ করা যাবে না। তখন অপরাধের কোনো দাগও ধুয়ে ফেলা যাবে না। ছবিটি শেষ হয়ে যায়, এবং চিরতরে শেষ হয়ে যায়।
মৃত্যু ছবিটিকে বাঁধিয়ে দেয় এবং প্রদর্শনের জন্য বিচার-দিনে পাঠিয়ে দেয়। কোনো নির্বাচিত দলের সামনে “ব্যক্তিগত আগাম প্রদর্শনী” নয়, বরং সমবেত এমন এক জনসমষ্টির সামনে প্রকাশ্য প্রদর্শনী, যাদের সংখ্যা কেউ গুনতে পারে না। কারণ ঈশ্বর প্রত্যেকটি কথা ও প্রত্যেকটি কাজের বিচার করবেন—তা ভালো হোক বা মন্দ। “মহান শ্বেত সিংহাসনের” সামনে উপস্থাপিত আমাদের জীবনের ছবিটি চিরকাল অপরিবর্তনীয় থাকবে। যদি সেই ক্যানভাস ঈশ্বরের মহিমার জন্য করা কাজ দিয়ে—তা যতই সামান্য হোক—সুশোভিত হয়, তবে জীবনের কাজ ঐশ্বরিক অনুগ্রহের চিরস্থায়ী স্মারক হয়ে থাকবে। কিন্তু জীবন যদি কেবল পাপপূর্ণ আত্মতৃপ্তির জন্যই ব্যয়িত হয়ে থাকে, তবে তার সেই দুর্দশাগ্রস্ত ছবিটি কেবল “লজ্জা ও চিরস্থায়ী অবজ্ঞার” জন্যই তুলে ধরা হবে।
তখন আমরা হয়তো অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে সেই প্রতিকৃতি বদলাতে ও তাকে উন্নত করতে চাইব, কিন্তু পেন্সিল আর রং আমরা পেছনে ফেলে এসেছি; হাত চিরতরে তার দক্ষতা হারিয়ে ফেলবে। আমরা হয়তো ন্যায়বিচারককে বারবার অনুনয় করে আরেকটি সুযোগ দিতে মিনতি করব। অপরিবর্তনীয় উত্তর হবে, “যে অধার্মিক, সে অধার্মিকই থাকুক; যে অশুচি, সে অশুচিই থাকুক। যে ধার্মিক, সে ধার্মিকই থাকুক; যে পবিত্র, সে পবিত্রই থাকুক।” এই বিষয়গুলো সত্য জেনে, পবিত্র আচরণ ও ঈশ্বরভক্তিতে আমাদের কেমন মানুষ হওয়া উচিত!
স্বাধীনতার জন্য শহীদ হিসেবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অভিজাত রাসেল যখন মৃত্যুদণ্ডের মঞ্চে তাঁর পাশে দাঁড়ানো এক বন্ধুর হাতে নিজের ঘড়িটি তুলে দিলেন, তখন বললেন, “এই ঘড়িটি নাও, কারণ সময়ের সঙ্গে আমার আর কোনো কাজ নেই। এখন আমার চিন্তা কেবল অনন্তকাল নিয়ে।” মৃত্যুপথযাত্রী শহীদের এই কথাটি আমাদের সবার জন্য যথাসময়ে বলা বাণী। আমরা যাজকেরা, যারা নতুন করে প্রভুর কাজে হাত দিতে যাচ্ছি, ভালোভাবেই মনে রাখতে পারি যে আমরা অনন্তকালের জন্য প্রচার করছি! এই অনুচ্ছেদটি পড়েন এমন প্রত্যেক বাবা-মা বিবেককে জিজ্ঞাসা করুন, “আমি কি আমার সন্তানদের কেবল এই জগতের জন্য নয়, বরং আগামী জগতের জন্যও গড়ে তুলছি?” প্রত্যেক ব্যবসায়ী নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, তিনি কি কেবল ফুটো থলে ভরার চেষ্টা করছেন, নাকি ঈশ্বরের গৃহাধ্যক্ষ হিসেবে স্বর্গে ধন সঞ্চয় করছেন? তরুণ বন্ধু, তুমি কি নিজেকে ভোগবিলাসে অভ্যস্ত করছ, নাকি অমর মুকুটের জন্য প্রস্তুত করছ?
এই গ্রীষ্মে মন্ট্রিয়লের একটি প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে আমি এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি দেখেছিলাম—“অনন্তকাল ছাড়া আর কিছুই দীর্ঘ নয়।” প্রত্যেক যাজকের অধ্যয়নকক্ষের জন্য এবং প্রত্যেক বাসগৃহের দেয়ালের জন্য এটি ছিল এক আদর্শবাক্য। আসুন, আকাশের খিলানে আমাদের সামনে সবাই এটি লিখে রাখি। “অনন্তকাল ছাড়া আর কোনো কিছুর জন্য বেঁচে থাকা সার্থক নয়।”
সময়ের ঝংকার-তোলা ঘণ্টাগুলো
তাদের পরিবর্তনের সুরে উঠুক-নামুক!
তবু মহিমান্বিত মৃদু স্বরে—
তাদের সকলের ঊর্ধ্বে গভীর ধ্বনিতে—
এমন এক কণ্ঠস্বর আছে, যা অবশ্যই শুনতে হবে,
আমাদের মুহূর্তগুলো যখন দ্রুত এগিয়ে যায়,
আর সে কেবল এই কথাটিই বলে
‘অনন্তকাল! অনন্তকাল!’



