আমাদের সবারই একটি গল্প আছে। কখনো কখনো কারও কারও মনে হয়, তারা যেন ইয়োবের মতো। কেউ বাবা-মা, জীবনসঙ্গী, সন্তান, ভাইবোন বা বন্ধু হারিয়েছেন। কেউ গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছেন। কেউ কেউ আর কখনোই অসুস্থতা থেকে সেরে উঠবেন না। আমাদের প্রিয়জনদের কারও এমন অসুখ হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী। হয়তো কোনো স্বামী বা বাবা-মা নির্যাতনকারী কিংবা অবিশ্বস্ত। ইয়োবের মতো আমাদের বন্ধুরাও হয়তো আমাদের বিরুদ্ধে চলে গেছেন। হয়তো মণ্ডলীতে এমন সমস্যা আছে, যা সমাধান করা অসম্ভব বলে মনে হয়। ব্যাপারটা হতে পারে কলিক-আক্রান্ত শিশু, কিংবা অতিরিক্ত চঞ্চল কোনো শিশুকে ঘিরে। হয়তো আমাদের শুধু সর্দি হয়েছে, তবু মনে হচ্ছে সবকিছুই ভুল পথে যাচ্ছে। এই তালিকার শেষ নেই। এই গানের কথার সঙ্গে আমরা নিজেদের মিল খুঁজে পাই।
ঝড় থেমে যাওয়া পর্যন্ত
মধ্যরাতের অন্ধকারে কতবার মুখ ঢেকেছি আমি,
ঝড় যখন মাথার ওপর গর্জায়, লুকোবার জায়গা নেই।
বজ্রের গর্জনের মাঝে, প্রিয় প্রভু, আমার কান্না শোনো,
ঝড় থেমে যাওয়া পর্যন্ত আমাকে নিরাপদে রেখো।
ধুয়া:
ঝড় থেমে যাওয়া পর্যন্ত, বজ্রের শব্দ থামা পর্যন্ত,
আকাশ থেকে মেঘ চিরতরে সরে যাওয়া পর্যন্ত;
দৃঢ় করে ধরে রাখো, তোমার হাতের ছায়ায় আমাকে দাঁড়াতে দাও,
ঝড় থেমে যাওয়া পর্যন্ত আমাকে নিরাপদে রেখো।
অনেকবার শয়তান ফিসফিস করে বলেছে, “চেষ্টা করার দরকার নেই,
দুঃখের তো শেষ নেই, সামনে কোনো আশাও নেই।”
কিন্তু আমি জানি, তুমি আমার সঙ্গে আছ, আর আগামীকাল আমি উঠব
সেইখানে, যেখানে ঝড় কখনো আকাশ অন্ধকার করে না।
দীর্ঘ রাত শেষ হলে আর ঝড় যখন আসবে না,
উজ্জ্বল শান্ত তীরে তোমার উপস্থিতিতে আমাকে দাঁড়াতে দিও;
সেই দেশে, যেখানে কখনো ঝড় আসে না, প্রভু, সেখানে যেন আমি
ঝড় থেমে গেলে তোমার সঙ্গে বাস করি।
—মোজি লিস্টার রচিত
আমি যখন ছোট্ট মেয়ে ছিলাম, ভাবতাম গীতিকার বজ্রঝড়ের কথা বলছেন। বজ্রঝড়ে আমি ভয় পেতাম। এখন বুঝি, তিনি জীবনের সেই ঝড়গুলোর কথা বলছিলেন, যেগুলোর মধ্য দিয়ে আমরা যাই। ২০১৩ সালের ১৪ জুলাই, স্বতঃস্ফূর্ত করোনারি ধমনির বিচ্ছেদের ফলে প্রাণঘাতী হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ আমাকে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। চল্লিশ বছর বয়সী একজন মায়ের জন্য কী ভীষণ ধাক্কা! ঝড় গর্জাচ্ছিল, বজ্রপাত হচ্ছিল। বিপদ থেকে লুকোনোর কোনো জায়গা ছিল না, কারণ বিপদটা আমার ভেতরেই ছিল। আমার হৃদ্যন্ত্র ছিল একটাই, আর সেটির ওপর ভরসা করা যাচ্ছিল না। যদি আবার এমন হয়? আমি কি মারা যাব? তাহলে আমার সন্তানরা মাকে হারাবে।
যখন ঘুম আসত না আর ভয় আমাকে গ্রাস করার হুমকি দিত, তখন মধ্যরাতের অন্ধকারে এই গানটি প্রার্থনা করতাম। প্রভুর উপস্থিতি আমার কাছে খুব বাস্তব ছিল। এই ঝড় পেরিয়ে আসার পর আমি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি যে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় ঈশ্বর কীভাবে নিজেকে আমাদের কাছে আরও গভীরভাবে প্রকাশ করেন। আমাদের নিজেদের সম্পূর্ণভাবে তাঁর হাতে সমর্পণ করতে হবে এবং বলতে হবে, “আমার ইচ্ছা নয়, তোমারই ইচ্ছা পূর্ণ হোক।”
শিষ্যরা যখন ঝড়ের মধ্যে সমুদ্রে ছিলেন, যিশু তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। তিনিও আমাদের সঙ্গে আছেন। আমরা তাঁর ওপর নির্ভর করতে পারি। তাঁর ইচ্ছার বাইরে কোনো কিছুই ঘটবে না। কেন কিছু ঘটে, তা আমরা সবসময় বুঝতে পারি না, কিন্তু তাতে সমস্যা নেই। এক বৃদ্ধ প্রচারক প্রায়ই এই কথাগুলো উদ্ধৃত করতেন:
“এখন নয়, তবে আগামী বছরগুলোতে,
হয়তো সেই উত্তম দেশে,
আমরা আমাদের অশ্রুর অর্থ বুঝব,
আর একদিন সেখানে সব বুঝতে পারব।”
আমাদের জীবনে ঈশ্বর যা ঘটতে দেন, তা মেনে নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মেনে নেওয়ার অর্থ এই নয় যে আমরা এ বিষয়ে কিছুই করব না। প্রয়োজন হলে আমরা ডাক্তারের কাছে যাব। সান্ত্বনা ও পরামর্শের জন্য অন্যদের কাছে যাব। আমাদের নানা রকম অনুভূতি থাকবেই, কিন্তু আমাদের মনে শান্তি থাকা উচিত। আমরা আত্মকরুণায় ডুবে থাকতে পারি না, কিংবা “বেচারা আমি” মনোভাব পোষণ করতে পারি না। আর আমরা জানি, যারা ঈশ্বরকে ভালোবাসে, যারা তাঁর উদ্দেশ্য অনুসারে আহূত, তাদের মঙ্গলের জন্য সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে—রোমীয় ৮:২৮। আমি তা বিশ্বাস করি। সবসময় সেই মঙ্গল দেখতে পাই না, কিন্তু ঈশ্বর দেখেন।
জীবন কখনো কখনো কঠিন, কিন্তু গানটি সেই সময়ের কথা বলে, যখন দীর্ঘ রাত শেষ হবে আর ঝড় আর আসবে না। প্রিয় বোনেরা, আসুন আমরা বিশ্বস্ত থাকি এবং জীবনের ঝড়ের মধ্য দিয়ে প্রভুর ওপর দৃঢ়ভাবে নির্ভর করি।
আর আমি এক নূতন আকাশ ও এক নূতন পৃথিবী দেখিলাম; কেননা প্রথম আকাশ ও প্রথম পৃথিবী লুপ্ত হইয়াছে; এবং সমুদ্র আর নাই। আর আমি যোহন পবিত্র নগরী, নূতন যিরূশালেমকে স্বর্গ হইতে, ঈশ্বরের নিকট হইতে, নামিয়া আসিতে দেখিলাম; সে আপন বরের জন্য সজ্জিতা কন্যার ন্যায় প্রস্তুত ছিল। আর আমি স্বর্গ হইতে এক মহাশব্দ শুনিলাম, সে কহিল, দেখ, মনুষ্যদের সঙ্গে ঈশ্বরের আবাস; তিনি তাহাদের সঙ্গে বাস করিবেন, আর তাহারা তাঁহার প্রজা হইবে, এবং ঈশ্বর আপনি তাহাদের সঙ্গে থাকিবেন, তাহাদের ঈশ্বর হইবেন। আর ঈশ্বর তাহাদের সমস্ত নেত্রজল মুছাইয়া দিবেন; এবং মৃত্যু আর হইবে না; শোক বা ক্রন্দন বা ব্যথাও আর হইবে না; কারণ প্রথম বিষয়গুলি লুপ্ত হইয়াছে। প্রকাশিত বাক্য ২১:১-৪।



